শিশুর এলার্জিঃ কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও করণীয়
এলার্জি কি?
এলার্জি আসলে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (immune system) একটি অতি-প্রতিক্রিয়া। শরীর কোনো নির্দোষ পদার্থকে “ক্ষতিকর” ভেবে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে — একেই এলার্জি বলা হয়। ত্বক, নাক এবং পায়খানা — এই তিনটি জায়গায় সাধারণত শিশুদের এলার্জির লক্ষণ সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।
এলার্জির প্রকাশ যেভাবে হয়
ত্বকে (Skin Allergy)
চুলকানি, চাকা চাকা হয়ে ফুলে যাওয়া (Urticaria)
ত্বক শুষ্ক ও ফাটলধরা (Eczema)
কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় র্যাশ বা লালচে দাগ
নাকে ও শ্বাসযন্ত্রে (Allergic Rhinitis / Asthma)
বারবার হাঁচি, পাতলা সর্দি, নাক বন্ধ
শুষ্ক কাশি, বুকের ভেতর শোঁ শোঁ শব্দ
রাতে বা ঠান্ডায় কাশি বেড়ে যাওয়া
পরিপাকতন্ত্রে (Food Allergy)
নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর বমি, পেট ব্যথা বা পাতলা পায়খানা
মুখ, ঠোঁট বা চোখ ফুলে যাওয়া (Severe reaction হলে Anaphylaxis হতে পারে)
মা ও বাচ্চার এলার্জি সম্পর্ক
যদি বাচ্চার এলার্জির প্রবণতা থাকে, মা এলার্জিক খাবার খেলে তার সামান্য অংশ দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যেতে পারে। তবে এটি সাধারণত হালকা মাত্রার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু বাচ্চা যদি সরাসরি এলার্জিক খাবার খায়, তখন সমস্যা অনেক বেশি হয় কারণ তখন পুরো খাবারটি শরীরে প্রবেশ করে।
সাধারণ এলার্জিক খাবার:
এলার্জিক খাবার সবার জন্য এক নয়। কারো ডিমে এলার্জি, কারো মাছ বা দুধে — এটি ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন।
কমন এলার্জিক খাবারগুলো হলোঃ
ডিম
বাদাম ও চিনাবাদাম
বিভিন্ন মাছ (ইলিশ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ)
গরুর দুধ ও লাল মাংস (গরু, খাসি)
গম, সয়াবিন, বার্লি
কিছু সবজি বা ফল (যেমন বেগুন, কচু, কচুর শাক, কচুর লতি, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি)
খাবার ছাড়াও:
ধুলাবালি (খুব কমন)
ধোঁয়া
ফুলের পোলেন
পোষা প্রাণির লোম
ফাংগাস বা ছত্রাক সংক্রমণ
শরীরে থাকা পরজীবী (worms বা mites)
ঠান্ডা আবহাওয়া বা ধুলাবালিতে থাকা ডাস্ট মাইট
প্রসাধনী বা পারফিউম থেকেও এলার্জি হতে পারে।
এলার্জি শনাক্তকরণ (Allergy Test)
সঠিকভাবে জানতে কোন জিনিসে এলার্জি হচ্ছে, নিচের টেস্টগুলো করা যেতে পারে—
Skin Prick Test: ত্বকে অল্প পরিমাণ অ্যালার্জেন দিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা হয়।
Specific IgE Blood Test: রক্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা হয়।
- Bioresonance test: এটি একটি বিকল্প পদ্ধতি, যেখানে শরীরের এনার্জি প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা হয়।
চিকিৎসা ও করণীয়
এলার্জিক খাবার বা বস্তু সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।
মৃদু এলার্জিতে: অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধে উপকার হয় (চিকিৎসকের পরামর্শে)।
ত্বকের ক্ষেত্রে: ময়েশ্চারাইজার বা বিশেষ মেডিকেটেড ক্রিম ব্যবহার করতে হয়।
হাপানিতে: চিকিৎসকের পরামর্শে ইনহেলার বা নেবুলাইজার ব্যবহার করতে হয়।
তীব্র এলার্জি প্রতিক্রিয়ায় (Anaphylaxis): দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
বাচ্চার যদি এলার্জিক সমস্যা থাকে তবে মা এলার্জিক খাবার খেলে সেটার কিছু অংশ দুধের মাধ্যমে বাচ্চার কাছে গিয়ে কিছুটা সমস্যা করতে পারে। কিন্তু বাচ্চা সরাসরি এলার্জিক খাবার খেলে সমস্যা সেই তুলনায় অনেক বেশি হয়। কারণ বুকের দুধের মাধ্যমে খুবই সামান্য খাবার পাস করে। আর সরাসরি খেলে পুরো এলার্জিক খাবারটাই সমস্যা করে।
প্রতিরোধে যা করবেন
✅ ধুলাবালি ও ধোঁয়া থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখুন।
✅ জামাকাপড় ও বিছানার চাদর গরম পানিতে ধুয়ে ব্যবহার করুন।
✅ প্রতি ২ দিন পর পরিষ্কার চাদর পরিবর্তন করুন।
✅ ঘর পরিষ্কার, শুকনো ও বাতাস চলাচলযোগ্য রাখুন।
✅ পোষা প্রাণি থাকলে তাদের পরিছন্ন রাখুন।
✅ এলার্জিক খাবার শনাক্ত হলে সেটি পুরোপুরি পরিহার করুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে
ঠোঁট, মুখ বা চোখ ফুলে গেছে
খাওয়ার পর হঠাৎ র্যাশ বা বমি হচ্ছে
দীর্ঘদিন ধরে কাশি বা সর্দি-হাঁচি চলছে
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া এলার্জির চিকিৎসার জন্যও বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে।
সতর্কতা (Disclaimer):
- আর্টিকেলটি শিক্ষামূলক ও সচেতনতামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
- সঠিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
© Dr-Adnan Al Berunie
MBBS, MS (Pediatric Surgery)
SCHP (Paediatrics) Australia
Child Specialist & Pediatric Surgeon
Medical College for Women & Hospital (MCWH)
Share via:
