হাম বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা

হাম হলো একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা Measles দ্বারা হয়। এটি প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে, তবে টিকা না নেওয়া বড়দেরও হতে পারে।
 
কীভাবে ছড়ায়?
  • কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে (ড্রপলেট)
  • আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে
  • ভাইরাস বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে
তাই একজন আক্রান্ত শিশু থেকে দ্রুত অনেক শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
 

লক্ষণ

হাম সাধারণত ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়:

১ম ধাপ (প্রাথমিক)

  • জ্বর (১০১–১০৪°F)
  • কাশি
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • চোখ লাল হওয়া (conjunctivitis)

২য় ধাপ

  • মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik spots)

৩য় ধাপ (র্যাশ)

  • ৩–৫ দিন পর সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি
  • প্রথমে মুখে, পরে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
 
জটিলতা (Complications)
হামকে হালকা রোগ মনে করা ভুল। জটিলতা হতে পারে:
  • নিউমোনিয়া
  • ডায়রিয়া
  • কানের ইনফেকশন
  • মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
  • অপুষ্ট শিশুর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
বিশেষ ঝুঁকিতে:
  • ৫ বছরের কম বয়সী শিশু
  • অপুষ্ট শিশু
  • ইমিউন কম (যেমন স্টেরয়েড/কেমোথেরাপি রোগী)
 
টিকা (Vaccination)
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।

বাংলাদেশে সাধারণ শিডিউল:

  • ৯ মাস: MR (Measles-Rubella)
  • ১৫ মাস: MMR (Measles-Mumps-Rubella)
আউটব্রেক পরিস্থিতিতে ৬ মাস থেকে হামের টীকা দেয়া যেতে পারে। 
 
প্রতিরোধের উপায়
  • সময়মতো টিকা দেওয়া
  • অসুস্থ শিশুকে আলাদা রাখা
  • হাত ধোয়া ও হাইজিন মেনে চলা
  • ভিড় এড়িয়ে চলা (আউটব্রেক হলে)
 
চিকিৎসা
হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত supportive:
  • জ্বর কমানোর ওষুধ (Paracetamol)
  • পর্যাপ্ত পানি/ORS
  • ভিটামিন A (খুব গুরুত্বপূর্ণ): ৬ মাস থেকে ১ বছরঃ রেটিনল ফোর্ট ৫০ হাজার ইউনিট ২ টা একসাথে, ১-৫ বছরঃ ৫০ হাজার ইউনিট ৪ টা ক্যাপসুল একসাথে।
  • প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক (secondary infection হলে)
গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে।
 
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?
  • জ্বর খুব বেশি বা ৩ দিনের বেশি থাকে
  • শ্বাসকষ্ট
  • খাওয়া বন্ধ করে দেয়
  • পানি শূন্যতা / প্রস্রাব আশংকা জনক ভাবে কমে যাওয়া
  • খিঁচুনি
  • অস্বাভাবিক ঘুম বা অচেতনতা
 
অভিভাবকদের জন্য মূল বার্তা
  • হাম ভয়ংকর হতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য
  • প্যানিক না করে সচেতন থাকুন
  • টিকা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
  • লক্ষণ দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিন

সদ্যজাত ও ৯ মাসের নিচের বাচ্চারা কি ঝুঁকিতে?
হ্যাঁ, ঝুঁকিতে আছে — বরং বেশি ঝুঁকিতে।

 

  • জন্মের পর কিছুদিন মায়ের অ্যান্টিবডি (maternal IgG) থাকে কিন্তু তা সবসময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা দেয় না
  • যদি মা আগে Measles না হয়ে থাকেন বা টিকা না নিয়ে থাকেন → শিশুর সুরক্ষা কম
  • ৬ মাসের পর maternal antibody দ্রুত কমে যায়।
  • ৬–৯ মাস = উচ্চ ঝুঁকি
 
এই বয়সে হলে সমস্যা বেশি কেন?
  • নিউমোনিয়া বেশি হয়
  • ডিহাইড্রেশন
  • Encephalitis এর ঝুঁকি
  • মারাত্মক হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
অর্থাৎ, এই বয়সে হাম সাধারণত severe course নেয়
 
টিকা কখন থেকে দেয়া যায়?
৬ মাস বয়স থেকে টিকা দেয়া যেতে পারে (early dose)
 
করণীয়ঃ

১. এক্সপোজার কমানঃ ভীড় এড়িয়ে চলুন

২. নিয়মিত হাত ধুয়ে বাচ্চার যত্ন নিন

৩. বাড়ি কেউ আক্রান্ত হলে শিশুকে আলাদা রাখুন

 
 
 

হাম বিষয়ে প্রশ্ন-উত্তর

প্রশ্নঃ পরিস্থিতি বিবেচনায় ৯ মাসের আগে হামের টীকা দেয়া যায় কিনা?
উত্তরঃ জ্বি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ডাক্তারের পরামর্শে ৬ মাস বয়স পূর্ণ হলে হামের টীকা দেয়া যাবে।

প্রশ্ন: বাচ্চার বয়স বেড়ে গেছে, কিন্তু আগে ৯ এবং ১৫ মাসের হামের টীকা (একটি বা উভয়টি) দেয়া হয়নি। কি করণীয়?

উত্তর: যদি টীকা কার্ড থাকে, তাহলে সরকারী EPI কেন্দ্র থেকে বড় বাচ্চাকেও ৯ বা ১৫ মাসের টীকা দেয়া যেতে পারে (availability সাপেক্ষে)। তবে টীকা কার্ড না থাকলে বা সরকারীভাবে না পেলে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে MMR vaccine (Mumps, Measles, Rubella) টীকা দেয়া যাবে।
 
প্রশ্ন: বাচ্চাকে ৯ এবং ১৫ মাসে হামের টীকা দেয়া হয়েছে। তবুও বর্তমান আউটব্রেকের জন্য কি বুস্টার প্রয়োজন?
উত্তর: যেসব বাচ্চা ৯ ও ১৫ মাসে টীকা নিয়েছে, তাদের প্রায় ৯৫% ক্ষেত্রে আজীবন ইমিউনিটি তৈরি হয়। তাই সাধারণভাবে বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয় না। তবে আউটব্রেক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত হামের টীকা প্রয়োজন অনুসারে দেয়া হয়। বর্তমানে সরকার হামের বিশেষ ক্যাম্পেইন করছে যেখানে অতিরিক্ত একটি MR টীকা দেয়া হচ্ছে।এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে MMR vaccine দিতে পারেন। এতে ক্ষতি নেই বরং এটি বুস্টার হিসেবে কাজ করবে। বিশেষ করে যেসব বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের অবশ্যই দেয়া উচিৎ।
 
প্রশ্ন: হামের টীকা দেয়া থাকলেও কি হাম হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, টীকা নেওয়ার পরও Measles হতে পারে। তবে সাধারণত রোগের তীব্রতা অনেক কম থাকে। টীকার মূল উদ্দেশ্য হলো মারাত্মক জটিলতা কমানো এবং মৃত্যু প্রতিরোধ করা।

 

প্রশ্ন: সর্দি-কাশি থাকলে হামের টীকা দেয়া যাবে কিনা?
উত্তর: হামেও ঠান্ডা কাশি হয়। যদি হাম না হয়ে সাধারণ ঠান্ডা কাশি হয়, সমস্যা সামান্য থাকে তবে দেয়া যাবে। যদি জ্বর থাকে, বেশি সর্দি-কাশি থাকে, হামের উপসর্গ থাকে তবে দেয়া যাবে না। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর দেয়া যাবে (সাধারণত ২ সপ্তাহ পর)
 
প্রশ্ন: অনেক দিন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়না। এখন বাচ্চাকে ভিটামিন-এ কিনে খাওয়ালে ৫০ হাজার ইউনিট একসাথে ৪ টা খাওয়াবো নাকি ২ টা করে ২ দিনে ৪ টা খাওয়াবো?
উত্তর:
৬–১১ মাস: ৫০,০০০ IU-এর ২টা একসাথে
১২–৫৯ মাস: ৫০,০০০ IU-এর ৪টা একসাথে
পরের ডোজ ৪–৬ মাস পর।
 
প্রশ্ন: ৫ বছর চেয়ে বড় বাচ্চাদের দেয়া যাবে কিনা?
উত্তর: ৫ বছরের বড় বাচ্চাকে ভিটামিন-এ খাওয়াবেন না, MMR দেয়া যাবে। তবে প্রয়োজন কম। 
 
প্রশ্ন: আমার বাচ্চার বয়স ৮ মাস ২৫ দিন বা ১৪ মাস ২৫ দিন। ৫ দিন পর সরকারী হামের টীকার ডেট আছে। এখন আমি ৯ মাসের হামের টীকা দিবো নাকি ক্যাম্পেইনের টীকা দিবো?
উত্তর: সরকারী ইপয়াই এর ৯ মাস বা ১৫ মাসের টীকা এবং ক্যাম্পেইনে দেয়া টীকা একই। MR টীকাই দেয়া হবে। সুতরাং আপনার যেটা সুবিধা সেটা দিতে পারেন। কোন সমস্যা নাই, একই টীকা – একই কাজ করবে। একটা দেয়ার ২৮ দিন পর কি অন্যটা দিতে হবে? দেশে হামের পরিস্থিতির উপড় নির্ভর করে প্রয়োজন হলে ১ মাস পর আবার টীকা দেয়া যাবে। তবে বর্তমানে টীকা দেয়াটা জরুরী। ১ মাস পরের পরিস্থিতির উপড় পরের সিদ্ধান্ত নিবেন।
 
প্রশ্নঃ পূর্বে হাম হলে পুনরায় হাম হতে পারে কিনা? 
উত্তরঃ হ্যা হতে পারে, তবে সম্ভাবনা খুব কম এবং জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
 
ডাঃ আদনান আল বিরুনী
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ও শিশু সার্জন
কনসালট্যান্ট, উত্তরা ওমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
error: Content is protected !!
Share via
Copy link