শিশুদের শরীরে ভিটামিন বি-৯ এর গুরুত্ব

ভিটামিন বি-৯, যা ফোলেট বা ফোলিক এসিড নামেও পরিচিত, একটি ভিটামিন যা মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কোষ বিভাজন ও ডিএনএ সংশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এটি ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য ভিটামিন বি-৯ অপরিহার্য, কারণ এটি গর্ভাবস্থায় সন্তানের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে সাহায্য করে।
 
ভিটামিন বি-৯ এর গুরুত্ব
  • শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের উন্নতি: ফোলেট মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র ঠিকঠাক বড় হতে সাহায্য করে।
  • রক্ত তৈরি করে: শরীরে নতুন রক্তের কণিকা তৈরি করে, যাতে বাচ্চারা দুর্বল না হয়।
  • রক্তের কণিকা উৎপাদন: লোহিত রক্তকণিকা (রেড ব্লাড সেল) তৈরিতে সাহায্য করে, যা রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমায়।
  • সুস্থ বৃদ্ধি: ফোলেট শরীরের কোষগুলোকে নতুন করে তৈরি করে, যা বাচ্চাদের দ্রুত ও সুস্থ বড় হওয়ার জন্য দরকার।
  • হার্টকে ভালো রাখে: এটি রক্তে হোমোসিস্টিন নামের একটা পদার্থের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যা হার্টকে সুস্থ রাখে।
  • রোগ প্রতিরোধে সহায়তা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করে।
 
ভিটামিন বি-৯ এর স্বল্পতার কারণ
  • ভিটামিন বি-৯ সমৃদ্ধ খাবার ঠিকমতো না খাওয়া।
  • কোনো পেটের সমস্যা থাকলে শরীর ঠিকমতো ফোলেট শোষণ করতে পারে না।
  • ·হজম ও শোষণের সমস্যা (যেমন সিলিয়াক ডিজিজ, ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ)
  • কিডনি ডিজিজ বা লিভার ডিজিজ
 
ভিটামিন বি-৯ এর স্বল্পতার ক্ষতি
  • রক্তস্বল্পতা: লোহিত রক্তকণিকা বড় ও অপ্রক্রিয়াশীল হয়, ফলে রক্তস্বল্পতা হয়।
  • স্নায়ুবিক সমস্যা: অবসাদ, দুর্বল স্মৃতি, বিভ্রান্তি, অবসাদগ্রস্ততা।
  • হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি: কারণ উচ্চ হোমোসিস্টিন মাত্রা রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে।
  • হজম সমস্যাঃ বদহজম, পেটফাঁপা, ডায়রিয়া ইত্যাদি।
 
ভিটামিন বি-৯ স্বল্পতার লক্ষণ
  • অবসাদ ও দুর্বলতা
  • মুখে ফোস্কা, জিভে ব্যথা বা লালচে ভাব
  • ত্বক শুকনো ও প্যাঁচানো
  • স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা (ঝাঁকুনি, নড়াচড়ার সমস্যা)
  • শ্বাসকষ্ট ও হার্টের দ্রুত ধড়ধড়
  • মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার সম্পর্কিত লক্ষণ (ব্লিডিং, হালকা লাগা)
  • স্মৃতিভ্রংশ, বিভ্রান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি
  • হজমতন্ত্রের সমস্যা যেমন বমি ভাব, ডায়রিয়া ইত্যাদি।
 
করণীয়
  • নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ: ভিটামিন বি-৯ সমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা।
  • কোন পেটের রোগ বা শোষণের সমস্যা থাকলে চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ।
  • সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
  • প্রয়োজনে ফোলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার।
 
ভিটামিন বি-৯ সমৃদ্ধ খাবার
ভিটামিন বি-৯ মূলত বিভিন্ন সবজি, ফল, ও ডালপালায় পাওয়া যায়। এর প্রধান উৎসগুলো হলো:
  • সবুজ পাতা সবজি: পালং শাক, মুলো পাতাসহ অন্যান্য সবুজ শাকসবজি
  • ডাল ও শিম: মসুর ডাল, মটর ডাল, ছোলা
  • ফল: কমলা, কিউই, কলা, স্ট্রবেরি, অ্যাভোকাডো
  • বীজ ও বাদাম: সূর্যমুখীর বীজ, বাদাম
  • ফোলেট সমৃদ্ধ আনাজ: ব্রাউন রাইস, ওটস, হোল হুইট ব্রেড
  • পোল্ট্রি ও মাংস: লিভার (মুরগি, গরু), ডিম
  • দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য
 
ভিটামিন বি-৯ স্বল্পতার চিকিৎসা
  • ফোলিক এসিড সাপ্লিমেন্টেশন (সিরাপ বি-৯): স্বল্পতা দূর করার জন্য সবচেয়ে সাধারণ ও কার্যকর চিকিৎসা হলো ফোলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ। অ্যানিমিয়া বা স্বল্পতা বেশি হলে চিকিৎসক রক্তস্বল্পতার মাত্রা অনুযায়ী ডোজ নির্ধারন করেন।

  • সাধারণ ডোজঃ তবে সাধারণ ভাবে ১২ মাসের নিচে বাচ্চার ক্ষেত্রে ১ চামচ করে ১ বেলা অথবা হাফ চামচ করে ২ বেলা – ২ মাস; ১-৫ বছরের বাচ্চার ক্ষেত্রে ১ চামচ করে ২ বেলা ২ মাস এবং ৫ বছরের বর বাচ্চার ক্ষেত্রে দেড় চামচ করে ২ বেলা ২ মাস খাওয়াতে পারেন।

  • ডায়েট পরিবর্তন: পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

  • নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা: রক্তে ফোলেটের মাত্রা ও অ্যানিমিয়ার প্রগতি পর্যবেক্ষণ করা।

 
 
ভিটামিন বি-৯ বা ফোলেট মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিটামিন। এর স্বল্পতা অ্যানিমিয়া, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং গর্ভাবস্থায় জন্মগত ত্রুটি সহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। সুতরাং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় ফোলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এবং স্বল্পতার লক্ষণগুলো সচেতন হওয়া জরুরি। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই সমস্যাগুলো প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

 
© Dr-Adnan Al Berunie
MBBS, MS (Pediatric Surgery)
SCHP (Paediatrics) Australia
Child Specialist & Pediatric Surgeon
Medical College for Women & Hospital (MCWH)
 
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
error: Content is protected !!
Share via
Copy link